আসিফ নজরুল-র গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য ও নতুন আইন/সংস্কার বিষয়ে (সম্পূর্ণ — বা বড় অংশ)
• গুম / গুম-খুন ও মানবাধিকার আইন
গুম, খুন ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার “এই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার” বলেছে।
তিনি বলেছে, “গুম প্রতিরোধে শুধু আইনগত সংস্কার যথেষ্ট নয় — প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জরুরি।” অর্থাৎ, শুধুমাত্র আইন করা নয়; গুম রুখতে নিরপেক্ষ তদন্ত, স্থায়ী কমিশন, বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও পুনর্বাসন প্রভৃতি বিষয়ও করতে হবে।
২০২৫ সালের প্রস্তাবিত “গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫” দ্রুত প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
• নতুন মানবাধিকার ব্রত (National Human Rights Commission) আইন
তিনি বলেছে, নতুন National Human Rights Commission Ordinance 2025 মানে “দশক জুড়ে চলে আসা মানবাধিকার লঙ্ঘন” বন্ধ করার জন্য।
এই আইন প্রণয়ের সাথে, কমিশনকে “স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত” করার পরিকল্পনা আছে — যাতে তারা সরকারের ইচ্ছার বহির্ভূতভাবে, গুম, খুন, নির্যাতন ইত্যাদির তদন্ত করতে পারে।
দপ্তরগুলোর ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য, একটি স্বতন্ত্র আইন (enforced disappearances and killings প্রতিরোধ আইন) প্রণয়নের কথাও বলেছেন।
• বিচারব্যবস্থা — মামলার জট কমানো, দ্রুত নিষ্পত্তি
২০২৫ সালের Legal Aid Services (Second Amendment) Ordinance 2025-এর ওপর বক্তৃতায় বললেন: যদি এই লিগ্যাল এইড সংস্কারগুলো সঠিকভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে পুরো দেশের আদালতে ফাইল হওয়া মামলার প্রায় এক-চতুর্থাংশ (≈ ২৫ %) লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
এরপর, অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সিভিল মামলায় মৌখিক আবেদন (oral petition) না করে, অ্যাফিডেভিট (affidavit)-ভিত্তিক আবেদন চালু করার ফলে, প্রতি মামলা গড়ে প্রায় ২ বছর সময় বাঁচানো যাচ্ছে।
ভবিষ্যতে, তারা একটি “দিরেক্টরেট” গঠন করার পরিকল্পনায়; অর্থাৎ লিগ্যাল এইড সেবা মূল ধারায় নিয়ে আসবে।
এছাড়া, মামলার জট কমানোর জন্য সিভিল ও ফৌজদারি (criminal) আদালতকে পৃথক করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
তারা বিচারপ্রক্লিয়া দ্রুত করার জন্য বিচারকদের সংখ্যা বাড়াতে এবং তাদের প্রশিক্ষণ উন্নত করতে কাজ করছে। ডিজিটালাইজেশন, আদালতের কার্যপ্রণালী আধুনিক করা — এসবই reform এর অংশ।
তিনি উল্লেখ করেছেন যে, Judicial Reform Commission-র প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে “৭০–৮০ %” ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
• আইন প্রক্রিয়া ও আইনগত পোস্ট / পদক্ষেপ
Code of Civil Procedure (CPC) সংশোধন করে দ্রুত ও সস্তা বিচার নিশ্চিত করা হবে।
Code of Criminal Procedure (CRPC) সংশোধনও প্রক্রিয়াধীন; আশা করা যাচ্ছে দ্রুতই তা পাস হবে।
লিগ্যাল এইড আইন সংশোধন করার পরিকল্পনা আছে, যাতে দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ আইনগত প্রতিকার পেতে পারে।
মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা (pre-case mediation) বাধ্যতামূলক করার বিধান চালু হয়েছে। এতে, সিভিল গঠনের মতো সাধারণ বিরোধ (ভাড়া, ভরণ-পোষণ, যৌতুক, পারিবারিক বিরোধ ইত্যাদি) আদালতে যেতেই হবে না, মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে।
• সময়সীমা, বাস্তবায়ন এবং সরকারের প্রবৃত্তি সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি
তিনি বলেছেন, কিছুคน অভিযোগ করেন যে, আইন করা হলেও পরবর্তী সরকার বদলে আগে করা আইন বাতিল করে দেবে। এ বিষয়ে উপদেষ্টা বলেছে, এজন্য তারা শুধু আইন নয় — “প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ” নিচ্ছে, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী ও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু একই সময় তিনি স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, যে সকল সংস্কার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয় বা ঐকমত্য দরকার — যেমন সংবিধান সংশোধন — সেগুলোর জন্য “জুলাই চার্টার” (July Charter) অপেক্ষা করতে হবে।
তার ভাষায়, সরকারের সময়সীমা এবং কাঠামো গুলোর তুলনায়, মানুষের (অধিকার, ন্যায় বিচার) দৃষ্টিকোণ থেকে reform-এর চাহিদা অনেক বেশি।
বিশ্লেষণ — কি বলছে তার ভাষণ থেকে
আসিফ নজরুল মনে করেন, পুরনো ব্যবস্থায় শুধু আইনপত্র পরিবর্তন করলেই সমস্যা শেষ হবে না। গুম, disappearances, খুন ইত্যাদির জন্য স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন (NHRC) গঠন প্রয়োজন।
বিচার ব্যবস্থার জট কমানোর জন্য শুধু বিচার বিভাগের কাজ নয়, সাধারণ মানুষের জন্য লিগ্যাল এইড এবং মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া আজগুবি নয়, বাস্তব প্রয়োজ্য এবং দরকারি।
বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হলে — মানুষ বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস ফিরে পাবে। তাই আদালত ডিজিটালাইজেশন, বিচারক সংখ্যা বৃদ্ধি, তাদের প্রশিক্ষণ — সব নিয়ে কাজ করছে।
তবে, সব পরিবর্তন হবে না রাতারাতি। রাজনৈতিক ঐক্য, নতুন সংবিধান বা সংবিধান সংশোধনের জন্য সময় লাগবে — “জুলাই চার্টার” এবং ভবিষ্যতের সরকারগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।
ভাষণের ভঙ্গি থেকে বোঝা যায় — তারা চান শুধু আইন না, বাস্তব পরিবর্তন; শুধু কাগজের ন্যায় নয়, মানুষ “ন্যায়” অনুভব করুক।
আসিফ নজরুল বলছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় (২০২৫) এমন আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু হয়েছে, যা বিগত ১৫–২০ বছরে হয়নি। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার রক্ষার জন্য নতুন আইন, স্বায়ত্তশাসিত মানবাধিকার কমিশন, আদালতের ডিজিটালাইজেশন, লিগ্যাল এইড ও মধ্যস্থতা, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার উদ্যোগ — সবই সামগ্রিকভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। তবে, পুরো মন্থর সাংগঠনিক সংস্কার ও সংবিধান সংশোধনের জন্য সময় লাগবে এবং ভবিষ্যৎ সরকারের দায় রয়েছে।

