ইসরায়েলি হামলার নৃশংসতার বর্ণনায় কাঁদছে গাজার এতিম শিশুরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ ও বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকা আজ মানবিক বিপর্যয়ের চরম কেন্দ্রস্থল। প্রতিদিনের হামলা, গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই জনপদে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিশুরাই। বাবা-মা হারিয়ে হাজার হাজার শিশু এখন অনাথ, গৃহহারা, ক্ষুধার্ত, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলার মতো বয়সও হয়নি যাদের—তারাই আজ পৃথিবীর করুণতম সাক্ষ্যবহন করছে।

নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, পরিষ্কার পানি, চিকিৎসা—কিছুই নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় অভাব, একটি পরিবারের স্নেহ। আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই পাওয়া অল্প কয়েকজন শিশু নিজেদের ভাষায় যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রকাশ করতে চেষ্টা করলে খুঁজে পাওয়া যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক জনগোষ্ঠীর হৃদয়বিদারক গল্প।

“আমার বাবাকে তিনটা গুলি করেছে”—বোমাবর্ষণের রাত্রির গল্প

৭ বছরের এক বালিকা দেয় সরল অথচ ভয়াবহ বর্ণনা—
“আমার বাবাকে তিনটা গুলি করেছে। ওরা যখন বাড়িতে ঢুকছিল, আমরা ভয় পেয়ে লুকাইছিলাম। বাবা দৌড় দিয়া আসছিল, কিন্তু পড়ে গেল। উঠে দাঁড়াইতে পারেনি।”

শিশুটি এসব বলতে বলতে তার কণ্ঠ কাঁপতে থাকে। অনেকক্ষণ সে নীরবে শুকনো মাটি আঁচড়াতে থাকে। ত্রাণকর্মীরা বলেন, সে প্রায় প্রতিদিন রাতে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে—“বাবা, দৌড়াও!”

“ধুলো ছাড়া কিছুই দেখিনি”—মাটির নিচে চাপা পড়ে বেঁচে যাওয়া এক শিশু

এক ৮ বছরের ছেলে আক্ষেপ করে বলে—
“বোমা পড়ার পর আমি শুধু ‘মা’ ডাকছিলাম… কিন্তু ধুলো ছাড়া কিছু দেখিনি। সবাই দৌড়াচ্ছিল। আমার হাত ধরে কেউ আমাকে টানছিল। পরে জানলাম আমার মা আর বাঁচে নাই।”

শিশুটিকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। তার মুখে তখনো ছিল ধুলো, চোখে শূন্যতা। উদ্ধারকারী বলে, শিশুটি দীর্ঘক্ষণ কাউকে চিনতে পারেনি—শুধু একটাই প্রশ্ন করছিল: “মা কোথায়?”

“স্কুল কোথায়? বই কোথায়?”—স্বপ্ন হারানো প্রজন্ম

গাজায় শত শত স্কুল ধ্বংস হয়ে গেছে। যেগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় শিক্ষাই হয়েছে বিলাসিতা।

১২ বছরের এক কিশোরী জানায়—
“আমি ডাক্তার হতে চাইতাম। কিন্তু এখন স্কুল নাই, বই নাই। আমাদের বাড়িও নাই। আমার পড়ালেখা শেষ। ভবিষ্যৎও শেষ।”

তার হাতে এখনো আছে একটা পুড়ে যাওয়া নীল রঙের ব্যাগ—একসময় সেটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

রাতে ঘুমহীন শিশুরা—যে কোনো শব্দে মনে হয় “আবার বোমা”

গাজার শিশুরা এখন ‘বোমা আঘাত-পরবর্তী মানসিক ট্রমা’তে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। রাত হলেই আতংক ছড়িয়ে পড়ে।

১০ বছরের এক ছেলের কথায়—
“রাতে ঘুমাতে পারি না। আকাশে কোনো শব্দ হলেই মনে হয় আবার বোমা পড়বে। আমরা সবাই লাফ দিয়ে উঠে বসি। আশ্রয়কেন্দ্রে কেউ ঘুমাই না ঠিকমতো।”

শিশুটির হাত কাঁপছিল। সে নিজের কানে আঙুল ঢুকিয়ে বলছিল—“বড় শব্দ হলে ভয় লাগে, খুব ভয়।”

“আমি অনাথ”—কিন্তু বুঝে না এর মানে কী

মাত্র চার বছরের এক শিশুর কথা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক—
“ওরা বলে আমি অনাথ… কিন্তু আমি বুঝি না। আমি শুধু মনে করি মা অনেকদিন ধরে ঘুমায়।”

ত্রাণকর্মীরা জানায়, এই বয়সী শিশুরা এখনো উপলব্ধি করতে পারে না ‘মৃত্যু’ মানে কী। শুধু তারা অনুভব করে—যে মানুষটি প্রতিদিন কাছে থাকত, সে এখন আর নেই।

“আমার কোনো ছবি নেই”—স্মৃতি হারানোর আর্তনাদ

এক কিশোর বলে—
“আমার ছোটবেলার সব ছবি ছিল আমাদের বাড়িতে। বোমায় বাড়িটা পুড়া গেছে। এখন কেউ বলতে পারে না আমি ছোটবেলায় কেমন ছিলাম।”

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে যোগ করে—
“পরিবারও তো নাই… কারো কাছে খোঁজ নিই কার?”

গাজায় শুধু মানুষই নয়, হারিয়ে গেছে প্রজন্মের স্মৃতি, ইতিহাস, পারিবারিক পাতাগুলো।

অপুষ্টি, ক্ষুধা, রোগ—একটি ধ্বংসশিবিরে পরিণত গাজা

মানবিক সংস্থা ও স্থানীয় চিকিৎসকরা জানান—

শিশুদের বড় অংশই তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে

অনেক শিশু ২৪–৪৮ ঘণ্টা খাবার না খেয়ে থাকে

ঠান্ডা, ডায়রিয়া, সংক্রমণে মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে

হাসপাতালে শয্যা নেই, ওষুধ নেই, স্যালাইন নেই

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত জনসমাগমে রোগ ছড়াচ্ছে দ্রুত

একজন মানবিক কর্মী বলেন—
“এখানে জন্মানো শিশুদের প্রথম দেখা জিনিস—ধুলো, ধ্বংসস্তূপ আর রক্ত।”

“আমরা যুদ্ধ চাই না—শুধু বাঁচতে চাই”

হাসপাতালের সামনে এক আহত শিশু বসেছিল। তার ডান হাত ব্যান্ডেজে মোড়া, পায়ে গভীর ক্ষত। সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করলে সে শুধু বলল—
“আমি শুধু বাঁচতে চাই। আমার ভাইবোনদেরও বাঁচতে দিতে চাই। আমরা যুদ্ধ চাই না।”

এই এক বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে আছে গাজার আজকের আর্তনাদ, একটি জাতির দীর্ঘশ্বাস, এক ভবিষ্যৎহীন প্রজন্মের দুঃখ।

বিশ্বের বিবেক কোথায় দাঁড়িয়ে?

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে—

গাজায় শিশুরা ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে

প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে

আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের আহ্বান যথেষ্ট নয়

কার্যকর যুদ্ধবিরতি ছাড়া শিশুদের রক্ষা সম্ভব নয়

গাজা এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়—এটি পৃথিবীর এক যন্ত্রণাদগ্ধ শিশুদের উপত্যকা।

উপসংহার

গাজার প্রতিটি এতিম শিশু আজ চলমান যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি নীরব অভিযোগ। তারা রাজনীতি বোঝে না, সীমান্ত বোঝে না—কিন্তু ক্ষুধা, ভয়, মৃত্যু বোঝে। তারা জানে তাদের পরিবার নেই, বাড়ি নেই, ভবিষ্যৎ নেই।

তাদের কণ্ঠে, কান্নায়, শুকনো চোখে লুকিয়ে আছে সমগ্র বিশ্বের প্রতি এক প্রার্থনা—

Share.
Leave A Reply