ট্রাম্প–শি জিনপিং ফোনালাপ: বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়? তাইওয়ান, বাণিজ্য, TikTok ও নিরাপত্তা ইস্যুতে দীর্ঘ আলোচনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিশ্ব রাজনীতির দুই সুপারপাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মাঝেই সোমবার অনুষ্ঠিত হলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহু প্রতীক্ষিত ফোনালাপ। দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেলেও, সাম্প্রতিক এই আলোচনাকে পর্যবেক্ষকেরা গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মোড় হিসেবে দেখছেন।

হোয়াইট হাউস ও বেইজিংয়ের দেওয়া রিডআউট অনুযায়ী, ফোনালাপে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে চারটি বিষয়—
তাইওয়ান, বাণিজ্য ও অর্থনীতি, TikTok ও প্রযুক্তি নিরাপত্তা, এবং বিশ্ব নিরাপত্তা ইস্যু।

তাইওয়ান প্রশ্নে কঠোর অবস্থান— সংঘর্ষ নাকি শান্তিপূর্ণ সমাধান?

ফোনালাপে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে,
“তাইওয়ান প্রশ্ন চীনের জাতীয় স্বার্থের কেন্দ্রে। পুনর্মিলন চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং কোনো বাহ্যিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।”

চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজের অংশ দাবি করে আসছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে সামরিক সহায়তা দেয় এবং দ্বীপটির নিরাপত্তাকে “ইন্দো-প্যাসিফিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ” মনে করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফোনালাপে জানান,
“যুক্তরাষ্ট্র ‘ওয়ান-চায়না পলিসি’কে সম্মান করে, তবে তাইওয়ান প্রণালির স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

দুই দেশের বক্তব্যেই কূটনৈতিক ভারসাম্য দেখা গেলেও, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সংঘাত এখনো পুরোপুরি কমে যায়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বাণিজ্য ও অর্থনীতি: এগোচ্ছে নতুন ১ বছরের বাণিজ্য কাঠামো

ফোনালাপে ট্রাম্প–শি আলোচনা করেন নতুন এক–বছরের বাণিজ্য চুক্তি কাঠামো নিয়ে, যা দুই দেশের মধ্যে চলমান শুল্ক উত্তেজনা কমানোর উদ্দেশ্যে তৈরি হচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের মতে—
“এটি ছিল উৎপাদনশীল ও ইতিবাচক ফোন কল।”

চীনও জানায়, দুই দেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। তবে প্রযুক্তি খাত, সেমিকন্ডাক্টর নিষেধাজ্ঞা, রেয়ার-আর্থ রপ্তানি— এসব ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান এখনো দূরত্বে।

TikTok ইস্যুতে জটিল সংকট— দুই দেশের বক্তব্য বিপরীত

ফোনালাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল TikTok, যা যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্প বলেন—
“যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। TikTok নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে।”

এর জবাবে শি জিনপিং অভিযোগ করেন—
“চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এমন মনোভাব বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভুল বার্তা দিচ্ছে। এটি উভয় দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।”

TikTok ইস্যুতে আপাতত সমঝোতার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং দুই দেশের বক্তব্যই যে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তা পরিষ্কার।

বিশ্ব নিরাপত্তা: ইউক্রেন, দক্ষিণ চীন সাগর ও ফেন্টানিল ইস্যু আলোচনায়

ফোনালাপে আরও আলোচনা হয়—

🔸 ইউক্রেন যুদ্ধ:

দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন হলেও, আগ্রাসন কমানোর পথে কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

🔸 দক্ষিণ চীন সাগর:

মার্কিন নৌবাহিনীর “Freedom of Navigation” কার্যক্রম এবং চীনের সামরিক উপস্থিতি উভয় পক্ষের জন্যই কৌশলগত উদ্বেগের বিষয়।

🔸 ফেন্টানিল:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে চীনে উৎপাদিত রাসায়নিক উপাদান থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ট্রাম্প এ ইস্যুতে আরও কঠোর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ করেন।

দুই দেশের সম্পর্ক কি নতুন পথে?

পর্যবেক্ষকদের ভাষায়:

এই ফোনালাপ ছিল ট্রাম্প–জিনপিং যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের প্রথম বড় পদক্ষেপ।

দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত থাকলেও,
তাইওয়ান, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনীতি— এসবই ভবিষ্যতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

অনেকেই এই কলকে “পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নতুন কূটনৈতিক বাতাস” বলে উল্লেখ করছেন।

বিশ্লেষণ (সংক্ষিপ্ত)

দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কিছুটা কমলেও,
মূল বিরোধ—তাইওয়ান ও প্রযুক্তি—এখনো অমীমাংসিত।

তবে ফোনালাপ দু’দেশের সম্পর্ককে আবারও আলোচনার পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেছে।

বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার অস্থিতিশীল সময়— এই আলাপ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

Share.
Leave A Reply