অবৈধ পথে ইতালি পাড়ি দিতে গিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন দেশের অসংখ্য যুবক
উন্নত জীবন, স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন আর আর্থিক স্বচ্ছলতার আশায় অবৈধপথে ইতালি যেতে গিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন দেশের অসংখ্য যুবক। দালালের প্রলোভন, “সহজেই ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে”—এ ধরনের মিথ্যে আশ্বাসে প্রভাবিত হয়ে তারা ঘরবাড়ি বিক্রি করে, ঋণ করে বা পরিবার থেকে শেষ সঞ্চয়টুকু জোগাড় করে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের অধিকাংশই পৌঁছাতে পারেন না গন্তব্যে।
লিবিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া হয়ে সাগরপথে ইতালিতে যাওয়ার এই রুটটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানব–পাচার রুটগুলোর একটি। নৌকা ডুবি, মধ্যপথে আটকে পড়া, অপহরণ, অর্থ আদায়, নির্যাতন—এসব হয়ে উঠেছে এই যাত্রার নিত্যসঙ্গী। কাগজপত্র ছাড়াই সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই বহু মাস বন্দিশিবিরে আটকে থাকেন, কেউ কেউ নিখোঁজ হয়ে যান চিরতরে।
পরিবারগুলো অসহায়ত্বে ভেঙে পড়ে। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে প্রিয়জনের খোঁজ না পাওয়া—সব মিলিয়ে তাদের জীবন আরও অস্থির হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং দালালচক্র দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এই বিপদ কমানো সম্ভব নয়।
সরকারি সংস্থা ও এনজিওগুলোও যুবকদের সতর্ক করে বলছে—“অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া মানেই মৃত্যুফাঁদে পা রাখা।” তবুও কাজের আশায়, ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্নে অনেকেই সেই ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করছেন না।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
উন্নত জীবনের স্বপ্ন, ইউরোপে স্থায়ী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবারের প্রতি আর্থিক দায়িত্ব—এই তিনটি কারণ মিলেই দেশের হাজারো যুবক ইতালি যাওয়ার জন্য দালালচক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। বৈধ কর্ম–ভিসা পাওয়া কঠিন হওয়ায় অনেকেই অবৈধ রুটকে “শেষ সুযোগ” হিসেবে দেখছেন। আর এ সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে একটি সুবিশাল আন্তর্জাতিক মানব–পাচার চক্র, যারা প্রতি বছর হাজারো পরিবারকে পথে বসিয়ে দিচ্ছে।
অবৈধ রুটের ভয়ংকর ট্রানজিট: লিবিয়া–তিউনিশিয়ার মৃত্যু–পথ
দালালরা সাধারণত প্রথমেই যুবকদের নিয়ে যায় দুবাই, ইজিপ্ট, মরক্কো বা আলজেরিয়ায়। এরপর শুরু হয় আসল দুঃস্বপ্ন—লিবিয়ার মরুভূমি পাড়ি।
এই রুটে সাধারণত যা ঘটে:
কয়েক দিন টানা মরুভূমি পথে হাঁটতে হয়
খাবার–পানির সংকট
লিবিয়ার মিলিশিয়া গোষ্ঠীর হাতে আটক হওয়া
জিম্মি করে পরিবার থেকে টাকা আদায়
পাচারকারীদের যৌন ও শারীরিক নির্যাতন
বন্দিশিবিরে মাসের পর মাস অমানবিক জীবন
শতকরা ৬০–৭০% মানুষ ইতালি পৌঁছানোর আগেই এই রুটে আটকে যায়—কেউ ফিরে আসে, কেউ নিখোঁজ হয়ে যায়।
সাগরপথ: বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
ইতালির ল্যাম্পেদুসা দ্বীপের দিকে যাত্রা করা ছোট ফোলানো নৌকা, কাঠের বোট বা পুরনো ট্রলারে থাকে ১০০–৩০০ মানুষ। কোনো লাইফজ্যাকেট নেই, নেই নৌচালকের অভিজ্ঞতা।
সাধারণত যে বিপদগুলো ঘটে:
নৌকা ডুবে যাওয়া
ইঞ্জিন বিকল হয়ে সাগরের মাঝখানে ভাসতে থাকা
ইউরোপিয়ান কোস্টগার্ডের হাতে ধরা পড়া
ভূমধ্যসাগরে তীব্র ঠান্ডায় মৃত্যুর ঘটনা
প্রতি বছর শত শত যুবকের মরদেহ সাগরে ভেসে ওঠে, অথচ পরিচয় মেলানো যায় না অনেকের।
দেশের পরিবারগুলো: ঋণে জর্জরিত, প্রিয়জনের খোঁজে দিশেহারা
অনেক পরিবার বাড়ি–জমি বিক্রি করে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত দেয় দালালদের হাতে। কেউ কেউ এনজিও বা স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন।
ফলে—
সন্তান নিখোঁজ হলে পরিবার ঋণের বোঝা বহন করতে পারে না
বাড়িতে সামাজিক চাপ তৈরি হয়
পরিবারের আর্থিক ভিত্তি পুরোপুরি ধসে পড়ে
পরিবারগুলো মানবাধিকার সংস্থার কাছে ধর্ণা দেয়, কিন্তু ফল মেলে না
দালালচক্র কীভাবে ফাঁদে ফেলে?
দালালচক্রের রয়েছে সংগঠিত নেটওয়ার্ক:
স্থানীয় দালাল →
দেশ–বিদেশে থাকা মূল এজেন্ট →
লিবিয়া/তিউনিশিয়ার ট্রানজিট এজেন্ট →
সমুদ্র–পথে পাঠানো অপারেটর
দালালরা সাধারণত যেভাবে যুবকদের প্রভাবিত করে:
“৩ মাসেই ইতালি”
“পৌঁছালে কাজ ঠিক করে দেওয়া আছে”
“ভিসা লাগবে না, সব ব্যবস্থা আমরা করি”
“এবার রুটটা খুব সেফ”
বাস্তবতা—এই প্রতিটি আশ্বাসই প্রায় শতভাগ মিথ্যা।
অভিজ্ঞদের বয়ানে ভয়াবহ বাস্তবতা
লিবিয়া হয়ে ফেরা কয়েকজন survivor-এর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী:
“দিনে একবার খাবার দিত—পাউরুটি আর পানি”
“টাকা না দিলেই পেটানো হতো”
“একই ঘরে ৫০–৬০ জনকে বন্দি রাখা হতো”
“নৌকাটা ছিল বাতিল—ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলে সবাই চিৎকার করছিল”
কেউ কেউ পরিবারের কাছে ভগ্নদেহে ফিরে এসেছেন।
কেউ আর কখনো ফিরতে পারেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন—
যুবকদের তথ্য–অভাব ও দালালদের মিথ্যা প্রচার বড় কারণ
মানবপাচার চক্র দমনে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন
নিরাপদ অভিবাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করতে হবে
সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই হারানো প্রজন্মকে রক্ষা করা সম্ভব নয়
সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কতা
আইওএম, ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে—
“অবৈধ রুট মানেই মৃত্যুঝুঁকি। প্রায় সবাই পথে বিপদে পড়ে।”
বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যেই কঠোর সীমান্তনীতি গ্রহণ করেছে। ধরা পড়লে যুবকদের ফেরত পাঠানো হয়, আবার কারও বিরুদ্ধে মামলা পর্যন্ত হয়।

